-“বউমা...ও বউমা! তোমার ছোটমাসি এসেচে,দুটো পান সেজে দিয়ে যাও তো বাছা!"
-“এই তো মা,এখুনি আনছি!” কথা শেষ করেই শাশুড়ি আর মাসি শাশুড়ির জন্য যত্ন করে পান সেজে নিয়ে এল বিন্দুবাসিনীর পুত্রবধূ পরমা।পানের বাটা নামিয়ে রেখেই হাসিমুখে প্রণাম করল একেএকে দুই শাশুড়িকে।
-“বেঁচে থাক মা! জন্ম এয়োতি হও!” পরমার মাথায় হাত রেখে বললেন স্বর্ণলতা। বিন্দুবাসিনীর ছোট বোন।
-“শোন বাছা তোমার মাসি কিন্ত দুপুরে খেয়ে যাবেন! রান্নাবানা করে রেখো কিন্তু”।
-“হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই মা! সে আবার বলতে!?” বলে হেসে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল পরমা।
শীতকালের সকাল।কমলালেবুর কোয়ার মতন নরম রোদ উঠেছে। মফ:স্বল এলাকার ফিরোজা রংয়ের একটা দোতালা বাড়ির ছাদ সংলগ্ন ঘরে বসে আছেন দুই সত্তর ছুঁই-ছুঁই বোন। বহুদিনের অসাক্ষাৎ,তাই আজ তাদের সুখ দু:খের গল্প যেন ফুরতেই চাচ্ছেনা।দুই বোনের গল্পের মধ্যেই ছুটে আসে বিন্দুবাসিনীর দুই ফুটফুটে নাতি নাতনি।
-“ঠাম্মি!! ওও ঠাম্মি! জানো আজ না তোমার হাতের নাড়ু গুলো সব ফ্রেন্ডসরা খেয়ে নিয়েছে! বলেছে তোদের ঠাম্মি নিশ্চয়ই দারুন ইয়াম্মি রান্নাও করে! তোদের কি মজা!” বলে হেসে গড়িয়ে পড়ে মিঠি,বিন্দুবাসিনীর নাতনি।
নাতি রুরুও দিদির সাথে গলা মিলিয়ে হাসে, বিন্দুবাসিনী দুজনকেই কোলের কাছে টেনে বলেন, “ বেশ তো গোপাল, এরপরের থেকে বন্ধুদের জন্যও নাড়ু বানিয়ে দেব'খন, এখন ছোট ঠাম্মিকে একটু প্রণাম কর তো!” বলার সাথেসাথে দুই ভাইবোন মিলে স্বর্ণলতাকে প্রণাম করতে গেলে তিনি ওদের কপালে চুমু খেয়ে বললেন, “ সে কি দিদু, তোমাদের কি প্রণাম করতে আছে! তোমরাই তো গোপালঠাকুর!”
একটু বাদে মিঠি আর রুরু ঘর থেকে চলে গেলে স্বর্ণলতা করুন হাসি হেসে বিন্দুবাসিনী কে বলল," সত্যিই তুই জিতে গেলিরে দিদি!আমি সেই হেরোই থেকে গেলাম! এমন লক্ষীমন্ত বউমা,এমন ছেলে দেবশিশুর মতন নাতিনাতনি! আর আমার দেখ!” বলতে গিয়ে কেঁপে উঠল স্বর্ণলতার গলা।বিন্দুবাসিনী মুখে একটা পান পুরে রহস্যময় হাসলেন শুধু।
স্বর্ণলতার স্বামী মারা গিয়েছেন আজ বছর চল্লিশ।বছর সাতাশের সদ্যবিধবা স্বর্ণলতা সেই থেকে একমাত্র ছেলে হেমন্ত কে বুকে করে মানুষ করেছেন তিনি, তারপর তার হিমু পড়াশুনো করল,চাকরি পেল বিয়ে করল তার সংসার হল,এর মাঝেই কবে যেন ধীরেধীরে নিজের সংসারেই অকিঞ্চিৎকর হয়ে উঠলেন স্বর্ণলতা।
বউমা মুক্তা সর্বক্ষণ খিটমিট করে, যেন তিনি আছেন জন্যে বড়ই অসুবিধে হচ্ছে তার!। হিমুও আজকাল তারসাথে বিশেষ কথা বলে না,এমনকি তার নয়নের মণি একমাত্র নাতনিটাকেও কাছে পান না তিনি ।
বড় সাধ হয় নাতনিটা কে গল্প শোনান, নাড়ু মোয়া বানিয়ে খাওয়ান, কিন্তু মুক্তার তাতে বড় আপত্তি!
দু বছর আগে ছেলে বউ এর চাপে পড়ে বাড়ি লিখে দিয়েছিলেন।ওরা বিক্রি করে দিয়েছে সে বাড়ি, পুরানো পাড়া ছেড়ে স্বর্নলতাকে উঠে আসতে হয়েছে একটা দুই পায়রার খুপরির মত ছোট্ট ফ্ল্যাটে।তাও বিন্দুমাত্র মন পাননি তিনি।আজ দিদির ভরা সংসার দেখে আনন্দের সাথেসাথে একটা ছোট্ট ঈর্ষার দংশনও টের পেলেন তিনি।
দুপুরে পরমা খুব যত্ন করে খাওয়াল। বিন্দুবাসিনীর ছেলে সমু অফিস থেকে ফোনে খোঁজ নিল মাসির যত্ন আত্তি হচ্ছে কিনা! সব পর্ব মিটলে দুই বোন আবার গল্পে বসলেন।
স্বর্ণলতা বললেন, “তুই বড় ভাগ্যবতী রে দিদি! ঠাকুর আরও দিন তোকে!” বিন্দুবাসিনী বললেন, “ তুই চাইলেই তুই থাকতে পারিস এমন সুখে! বলিস তো পথ বাতুলাতে পারি!”। অবাক হয়ে স্বর্ণলতা বললেন,
-“কি যে বলিস দিদি! আমার আর সুখ! কি পথ বাতলাবি শুনি!?” বিন্দুবাসিনী ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি হেসে বললেন,
-“ শোন, আজ বাড়ি ফিরে ছলে বলে বউমার কানে তোর গয়নার বাক্সের কথা দিবি!”
-“কি যে বলিস দিদি! আমার আর সুখ! কি পথ বাতলাবি শুনি!?” বিন্দুবাসিনী ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি হেসে বললেন,
-“ শোন, আজ বাড়ি ফিরে ছলে বলে বউমার কানে তোর গয়নার বাক্সের কথা দিবি!”
-“গয়নার বাক্স! হাসালি দিদি! সেসব গয়না কোথায় এখন! হিমুর বাপের চিকিৎসা আর হিমুর লেখাপড়ার পেছনেই তো সব চলে গেল..!”
-“আহ:! বাক্সখান আছে তো নাকি! সেটাই দেখাবি!”
-“ কি বলিস দিদি তারপর দেখতে চাইলে! বাক্সে তো শুধু একজোড়া কানবালা পড়ে আছে! আমার দিদিভাইয়ের বিয়ের জন্যে বড় কস্টে সেটুকু রেখেছি!”
-“ কি বলিস দিদি তারপর দেখতে চাইলে! বাক্সে তো শুধু একজোড়া কানবালা পড়ে আছে! আমার দিদিভাইয়ের বিয়ের জন্যে বড় কস্টে সেটুকু রেখেছি!”
-“বেশ তো! তোর ছেলে বউ তো আর জানে না সে কথা! শুধু এটুকু জানে যে বাবা আমাদের দুই বোনকে বিয়ের সময় দুইবাক্স গয়না দিয়েছিলেন, তাই তো!?”
-“তা ঠিকই। কিন্তু তাতে কি?”
-“আরে পোড়ামুখি! এটাও বলে দিতে হয়? লোভ দেখা ওদের। গয়নার বাক্সের লোভ!”
-“তা ঠিকই। কিন্তু তাতে কি?”
-“আরে পোড়ামুখি! এটাও বলে দিতে হয়? লোভ দেখা ওদের। গয়নার বাক্সের লোভ!”
-“ বলিস কি দিদি! ছেলে বউ কে মিছে আশা দেব!? সে তো পাপ হবে রে! অধর্ম হবে!”
-“ রাখ তোর পাপপুণ্য! আগে নিজে বাঁচ তো! তারপর সেসব দেখিস! বুড়ি মা কে অছেদ্দা করে ওরা পাপ করছে না?”
-“ রাখ তোর পাপপুণ্য! আগে নিজে বাঁচ তো! তারপর সেসব দেখিস! বুড়ি মা কে অছেদ্দা করে ওরা পাপ করছে না?”
-“সে যার যার নিজের ধর্ম দিদি! আমি চোখ বুজলে ওরা যখন জানবে তখন ঘেন্না করবে যে ওরা আমায়!”
-“দেখ স্বর্ণ! স্বয়ং ধম্মরাজ যুধিষ্ঠিরও মহাভারতে মিথ্যাভাষণ করেছেন, সংসারটা কি মহাভারতের যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু? মরে গেলে কে ভালবাসল আর কে ঘেন্না করল তাতে কিছুই যায় আসেনা, যতদিন বাঁচবি ততদিন একটু আদরে আহ্লাদে বাঁচ দেখি!”
স্বর্ণলতা রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল এবারে,-“ দিদি তুইও কি!?” বিন্দুবাসিনী করুন হেসে বললেন
-“তা নয়ত কি? এমনি এমনি ছেলে বউ পায়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে আমার!? সব গয়নার বাক্সের মহিমা! তার জন্যেই না এত আদর যত্ন!”
-“তা নয়ত কি? এমনি এমনি ছেলে বউ পায়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে আমার!? সব গয়নার বাক্সের মহিমা! তার জন্যেই না এত আদর যত্ন!”
-“ কতদিন মিথ্যা বলে যাবি দিদি?”
-“ যতদিন না চোখ বুজি! আমি চোখ বুজলে তারপর না ওরা জানবে সে বাক্সে মাত্র একটা মটরমালা পড়ে আছে! আমার মিঠি আর রুরু কে ওই হারটাই অর্ধেক অর্ধেক দিয়ে যাব! তা সেও কম হবে না দুই ভাইবোনের কম করে এক এক ভরি করে তো থাকবেই ওতে! বাকি সবই তো এই সংসারের পিছনেই গেল!”
-“ যতদিন না চোখ বুজি! আমি চোখ বুজলে তারপর না ওরা জানবে সে বাক্সে মাত্র একটা মটরমালা পড়ে আছে! আমার মিঠি আর রুরু কে ওই হারটাই অর্ধেক অর্ধেক দিয়ে যাব! তা সেও কম হবে না দুই ভাইবোনের কম করে এক এক ভরি করে তো থাকবেই ওতে! বাকি সবই তো এই সংসারের পিছনেই গেল!”
-“তুই পাপ পুণ্যের ভয় করিস না দিদি! স্বর্গনরক মানিস না?”
-“ রাখ তোর স্বর্গনরক! বেঁচে থাকতে কম নরক দর্শন কম হয়েছে তোর!? মৃত্যুর পরে ওসব এক, এই কটা দিন একটু বাঁচার মতন বাঁচ দেখি!” স্বর্ণলতা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
-“ রাখ তোর স্বর্গনরক! বেঁচে থাকতে কম নরক দর্শন কম হয়েছে তোর!? মৃত্যুর পরে ওসব এক, এই কটা দিন একটু বাঁচার মতন বাঁচ দেখি!” স্বর্ণলতা নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
বাড়ি ফিরেও দ্বিধা কাটতে চায়না তার।
সেদিন রাতে স্বর্ণলতা শোনে মুক্তা হিমুকে আদুরে গলায় বলছে, “ তুমি ওনাকে বরং ‘বারানসি’ নামের বৃদ্ধাশ্রমটাতেই রেখে এস! মেয়েটা বড় হয়েছে ওর তো একটা স্পেসের দরকার!” হিমু উত্তর করল, “ হু! কথাটা মন্দ বলনি..নেক্সট উইকেই নাহয়..” আর শুনতে পারেননা স্বর্নলতা। গলার কাছে একটা নোনা ডেলা আটকে আসে।
পরের দিন সকালে নাতনি কে কাছে পেয়ে স্বর্ণলতা বলেন, “ জান তো দিদিভাই! বাবা বিয়ের সময় আমায় এই গয়নার বাক্সে বিশ ভরি গয়না দিয়েছিলেন, সেসব আমি তোমার বিয়ের জন্যে রেখে দিয়েছি! সেসব তোমাকে দিয়ে যাব!!” স্বর্ণলতার নাতনি বলে, “ আমাকে দেখাও ঠাম্মু গয়না!”
-“এখন না দিদিভাই! আগে তোমার বিয়ের দিন আসুক তো!
-“এখন না দিদিভাই! আগে তোমার বিয়ের দিন আসুক তো!
সন্ধ্যে নাগাদ স্বর্ণলতা বোঝেন ওষুধে কাজ হয়েছে,মুক্তা মিস্টি মুখে কথা বলে গেছে, হিমুও অফিস থেকে এসে বলে গেছে-“ সামনের মাসে তোমার ঘরেও একটা এসি লাগিয়ে দেব মা! যা গরম পড়েছে!” স্বর্ণলতা হাসেন শুধু।
মনেমনে দিদি কে একটা প্রণাম করেন আর ভাবেন আর একদিন দিদির কাছে গিয়ে ফন্দি এঁটে আসতে হবে!
আমৃত্যু এই মিথ্যাভাষণ, এই অভিনয় কে সহচরী করতে হবে যে তাকে!।










