জানালাটা অপরিষ্কার। রুমটাও নিজের না।জানালার ফাঁকা দিয়ে যে চাঁদটা দেখা যাচ্ছে ঔটাও বেরসিক। চাঁদের আলোটা নয়, রাতের কালোটাই যেন শফিককে আধমরা করে রেখেছে। ছাত্রাবাসের এই জঞ্জালসমৃদ্ধ জীবনে পরিবারের কথা মনে পড়ে তার। তবুও ছাত্রাবাসের বন্ধুদের সাথে বেশতো মানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সময়ে সময়ে অদৃশ্য কিছু শক্তি পাল্টে দেয় সব হিসাব- নিকাশ। নিজের ভেতরে থাকা বাহাদুরিটা আচমকাই টেনে বের করে ফেলে। শফিকের বাসা খুলনাতে। বাবার চাকরীর দোহাই দিয়ে একেকবার একেক জায়গায় শিফট হতে হয়নি তাকে। দাদা-বাবার ভিটেতেই জন্মেছে, দশটা বারোটা ভাইয়ের স্নেহে বেড়ে উঠেছে। 'ভাইদের স্নেহে বেড়ে উঠেছে'- কথাটা না বলে "বোনদের আদরে বড় হয়েছে' বললে শুনতে ভালো লাগতো। কিন্তু বললাম না। কারন, ভাইদের স্নেহে বেড়ে ওঠার সাথে 'রাজনৈতিকউত্থান' কথাটা খুব ভালোভাবে যায়। স্কুল জীবনে শফিকের চোখ ফোটেনি। ফুটেছে কলেজে উঠে। টুকটাক রাজনীতির শুরু তখন থেকেই। রাজনীতি না বলে তোষামোদি বললেই ভালো হয়। 'ওমক নেতার তোমক এজেন্ডা' বাস্তবায়ন করতে না পারলে কিসের নেতা? ওমক ছাত্রাবাসের তোমক ছাত্রকে ব্লাকমেইল করে মোবাইল আদায় করতে না পারলে কিসের ক্ষমতা? সেবারের কথাটা এখনও মনে পড়ে। স্থানীয়রা এমনিতেই ছাত্রাবাসের ছাত্রদের গোনায় ধরতো না। তার ওপর গোপাল ছেলেটা ছিল একটু বেশিই বোকাসোকা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে চোখটা মাটিতেই রাখতো। তবে ছেলেটা ছিল আপাদমস্তক ক্রিকেটপাগল। এক চায়ের দোকানে খেলা দেখতে দেখতে পরিচয় হয় ওর সাথে। ওমন নিরীহ ছেলে খুব কমই দেখেছি। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শুনলাম গোপালের কপালটা পুড়ে গেছে। কোন এক মেয়েলি কেসে শফিকবাহিনী তাকে আচ্ছা ধোলাই দিয়েছে। গোপালের নোকিয়া-১১১ সেট, নগদ কয়েকহাজার টাকা, ঘরের দু'চারটা আধাদামী সামগ্রী- সবটাই এখন শফিকের। এ আর নতুন কী? এরকম অনেক গোপালের কপাল পুড়িয়েই শফিকদের দিন চলে। যাহোক, চোখ ফোটার পর থেকে শফিকের কিন্তু আর পড়ালেখা হয়নি। বছর চারেক পর ক্ষমতারও পরিবর্তন হয়। চাপে পড়ে রাজনীতি ছেড়ে দেয় শফিক। বিয়েটাও সেরে ফেলে। তবে যোগ্যতার অভাবে চাকরী হয়না তার। অবশেষে একটা এনজিও মুখ তুলে তাকায়। পোস্টিং হয়ে যায় সাতক্ষিরা। সাতক্ষিরাতে বেশ চলে শফিকের। মাস ঘুরতেই কিছু টাকা পাঠায় বাড়িতে। নিজে কষ্ট করে ছাত্রাবাসে থাকে। তাতে ওর দুঃখ নেই। কিন্তু ঐযে, অদৃশ্য শক্তিগুলার কথা বলছিলামনা? ঐগুলা আসলেই নাছোড়বান্দা। একদিন সন্ধ্যায় শফিকের বস্ত্রহরণ করা হয়। কোন একমেয়েলি কেসে নাস্তানুবাদ হতে হয় তাকে। মোবাইল আর মাসের রোজগারের পুরোটাই যায় গোপালের পকেটে। এই গোপাল সেই গোপালই। আমাদের কপালপোড়া নিরীহ গোপাল। শফিককে পেদিয়ে পরদিনই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আধমরা শফিককে গোপাল বললো, "এলাকার কুত্তা এলাকায় লাফায় বেশি, বাইরে তাগো কেউ গোনেনা। এইডা আমার এলাকা। এলাকায় আমি লাফাই না। তয় তোগো মত কুত্তা পাইলে ছাড়িও না।" জানালাটা অপরিষ্কার। রাতের আকাশে পূর্নিমার চাঁদ। কিন্তু বাহাদুরিটা হাতবদল হয়ে যখন নিজেকেই চপেটাঘাত করে, তখন ঔ চাঁদের কোন মূল্য থাকেনা।।





