![]() |
| Humayun Ahammed |
টাকা ফেরত দেবেন নাহ?
দোকানদার চোখ কপালে তুলে ফেললো।কপাল তুলে ফেললো মাথায়। তারপর খুব বিস্মিত ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকালো।
-গুললীফ ৯ টাকা হইছে জানেন নাহ?
আমি চোখ মাথায় তুলে ফেললাম অবাক হবার ভান করে। আমাকে বাবা শিখিয়েছেন "শোন বাবা হিমু,যে যেমন তাহার সাথে তেমন ভাবে চলা যাইবে না।তোমাকে তাহার চেয়েও এক ডিগ্রী উপরে থাকিতে হইবে।কেউ যদি ছোট লোক হয়,তুমি হইবে তাহার চেয়েও এক কাঠি বেশি ছোট লোক।কেউ যদি রাগিয়া গলা চড়াইয়া কথা বলে,তুমি তাহার চেয়েও গলা চড়াইবে। তবেই টিকিয়া থাকিতে পারিবে।তুমি হইতেছো মহাপুরুষ। সুতরাং তোমাকে জীবনে বহু বিপর্যয়ের ভেতর দিয়া যাইতে হইবে।তোমাকে বিপর্যয় কে বিপর্যস্ত করা শিখিতে হইবে।"
আমি এজন্য দোকানদারের মতো কপালে না,অবাক হয়ে মাথায় চোখ তুলে ফেলেছি।
-আমার এক টাকা ফেরত দেন।
-এক টাকা ভাংতি নাই।
দোকানদার উদাস হয়ে সিগারেট ধরিয়ে টানছে।
কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। এক দুই টাকার পয়সা হিসেব হিমুরা করে না। আমি আবার রাস্তায় নেমে আসলাম। পায়ের নিচে কাদা,যেহেতু বর্ষা কাল,মাথার উপরে সূর্য যেহেতু আমরা গাছ পালা কেটে ৬ ঋতু কেটে ৩ ঋতু বানিয়েছি ।সূর্যের ডিসপ্লে, ফুল ব্রাইটনেস এ আছে। কুকুর দুই একটা রাস্তায় মরে পড়ে নেই কেনো সেটাই বুঝতে পারছি না।
ইদানিং কিছুই মনে থাকে না।কোথায় যাবার জন্য মেস থেকে বেড়িয়েছিলাম মনে করতে পারছি না।মহাপুরুষ দের কোনো গন্তব্য না থাকলেও মানুষ হিসেবে আমরা সবাই কোনো না কোনো গন্তব্যের পথে হাঁটছি।
৯ টাকা ইতিমধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।সব কিছু বাড়ছে। আলুর দাম,পটলের দাম,চালের দাম,সিগারেটের দাম,ঝকঝকে পাজেরোর দাম।শুধু মানুষের দাম উলটা দিকে হাটছে।পদ্মা সেতু নদীর উপর মোটামুটি এক রকম "খাড়া " হয়ে গেছে।তবুও দাম বাড়ার কারণ বোঝা যাচ্ছে না।
বুঝলেন হিমু ভাই, সব হইলো কপাল।শান্তি নাই। অশান্তিতে থাকলে যে বিড়ি টানুম হেই বুদ্ধিও নাই। বিড়ির দাম এক টাকা।
আমি চট করে পেছনে তাকালাম। হুইলচেয়ারে বসা ফকির সাহেব আমার পিছে পিছে আসছেন।পেছনে তার দশ বছরের ছেলে।অভিজাত এলাকার ফকির।তার এলাকা ধানমন্ডি গুলশান এর আশেপাশে।যদিও তারচেয়ে অভিজাত ফকিরগণ সেই এলাকায় বাস করে।কিন্তু সবচেয়ে অভিজাত ফকির হলেন আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী।তিনি ভিক্ষা না,ট্যাক্স আদায় করেন। পারলে সব দোকান বাসা বাড়ি অফিস আদালতের গেটে দান বাক্স বসিয়ে দিতে চান।সেই দান বাক্সের নাম হবে ট্যাক্স বাক্স।দৈনিক বন্দোবস্তে সবাই টাকা দেবে বাক্সে।
আমি বিড়ি নিয়ে বিড়ি ধরালাম।
আব্বাস মিয়া এই দিকে কেনো তুমি? আর বইলেন না হিমু ভাই।পুলিশ সরায় দিছে।কি নাকি জঙ্গি টঙ্গি আছে।একশনে যাবে আইজ।পুরা এলাকা ঘিররা রাখছে।আমারে ধমক দিয়া কইলো "ভাগ এইখান থেইকা "।
আমি ভাগছি।
এইটা তো ঠিক হয় নাই।তোমার এলাকা থেকে তোমাকে ভাগায় দেয়?চলো তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি। এখন গেলে বউ ঢুকতে দিবো না। তাহলে কি করবে? বুঝতাছি না।ঢাকা শহরের ফকির হইলো কুত্তাগো মত। সবার নিজেগো এলাকা আছে।এক এলাকা থেইকা আর এক এলাকায় গেলে বসবার দিবো না।
তাহলে তোমার এলাকায় চলো। ওইখানে পুলিশে গিজগিজ করতেছে। আর্মিও আসছে দেখলাম।
তুমি চলো। আমি আছি নাহ?
আব্বাস আলীর সাথে পরিচয় অন্যভাবে।ছেলেকে থাবড়া দেয়ায় ছোট মিন্টু মিয়া কাদতে কাদতে বাড়ি চলে গেছে গোসা করে বাপের সাথে।আব্বাস উদ্দিন হুইল চেয়ারের পাশে বসে ছিলো।
আমার গায়েই বোধ হয় "I'm in your service " টাইপ কথা লেখা আছে।পা খালি।গায়ে কটকটে রঙ জ্বলে যাওয়া হলুদ পাঞ্জাবি আর মুখ ভর্তি দাড়ি চুলের জঙ্গল দেখেই বোধ হয় আব্বাস মিয়া আমাকে তার গোত্রের লোক ভেবেছিলো। হুট করে ডাক দিলো পেছন থেকে।
ও ভাই সাব শুনবেন? আমি কাছে যেতেই আব্বাস মিয়া গলা নামিয়ে ফেললো।এমন ভাবে নামালো যে, আমি তার মুখের কাছে কান নিয়ে যেতে বাধ্য হলাম। ভাই আমারে একটু বাড়িত দিয়া আসবেন?পোলাডায় গোসস কইরা বাড়ি চইলা গেছে।আমারে না দিয়া আসেন,অন্তত চেয়ারডায় তুইলা দেন।
সেই দিন আব্বাস মিয়া আমার পরিচয় পেয়ে আমাকে আর ছাড়েনি।ভাত খাওয়ায় তারপর ছেড়েছে।
আজকে কি খাওয়াবে কে জানে।
আব্বাস মিয়ার কথা ভুল।এলাকা পুলিশে নাহ,আর্মিতে না,কাঁধে বন্দুক ওয়ালা লোকজনে না,কাধে ক্যামেরা আর হাতে মাইক্রোফোন ওয়ালা লোকে গিজগিজ করছে। এক একেক সময় এক এক জেনারেশান যায়।এটা হলো "লাইভ" এর জেনারেশন। সব কিছুই এখন লাইভ চল জঙ্গিরা জিম্মিদের আটকে রেখেছে আর সাংবাদিক ভাইরা লাইভে আছেন।পুলিশ ভাইরা বাধ্য হয়ে উদ্ধার কর্ম বাদ দিয়ে সেই লাইভ টিভিতে সাক্ষাতকার দিচ্ছেন।
কিন্তু আব্বাস মিয়ার ভিক্ষা আজকে করতেই হবে।জঙ্গি ফঙ্গি নিয়ে মাথা ঘামালে হবে না। জঙ্গিরা হলো আহাম্মক।মিছেমিছি রাস্তার মানুষ আটকে রেখে কি আর দাবি আদায় করা যায়। আটকাতে হবে অর্থমন্ত্রীদের।ট্যাক্সের টাকায় তারা জামিনে মুক্তি নিয়ে বের হয়ে আসবেন। আর মরে গেলে ট্যাক্সের টাকার হাত থেকে জনগণ মুক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসবে।
কোনো পক্ষেরই কোনো লস নাই।সামনে ব্যারিকেড দেয়া।আর আগানো যাবে না।আমি রাস্তার পাশে আব্বাস মিয়াকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
দুজন পুলিশ গাড়ির পেছনে পেছনে কাভার নিয়ে আমাদের দিকে আসছে।
-ওই মিয়া তোমারে না ভাগায় দিলাম।আবার আসছো কেন?
আব্বাস মিয়া কাচুমুচু করছে।আমিই এগিয়ে গেলাম।
- ওনার বউ ওনারে ওনার পজিশনে থাকতে বলছেন।নাহলে খাওয়া বন্ধ।বাঙালি স্বামীরা পুলিশের চেয়েও বউ এর হুমকি বেশি ভয় পায়।উনি তাই ওনার পজিশনে চলে আসছেন।
-ওই মিয়া আপনে কথা কন কেন? আপনারে কিছু জিগাইছি?
আমি ধমকে আহাম্মক হলাম না।পুলিশরা ইউনিফর্ম পড়েই শুধু মানুষকে ধমকাধমকি করার জন্য।এছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই।আমি আমার বাবার দেয়া শিক্ষা মতো পুলিশকে ডাবল ধমক দিলাম।
-থাবড়া খাইছিস? জানিস আমি কে?আমি স্যারের এসিস্টেন্ট।যা আমাদের জন্য জ্যাকেট নিয়া আয়।
সম্ভবত এরা দুজন কন্সটেবল শ্রেণির কিছু হবে।এক ধমকেই কাজ হবে নিজেও বুঝতে পারিনি।আমার প্রতিভায় আমি
নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আরও মুগ্ধ হলাম তাদের ফিরে আসা দেখে। হাতে দুটো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট।তারা আমাকে কোন স্যারের এসিস্টেন্ট ভেবেছে কে জানে।
আমি আর আব্বাস মিয়া ছটপট বুকে "police " লেখা জ্যাকেট পড়ে নিলাম।ঠুস করে একটা গুলি খেলে আজকে আর ভিক্ষে করা হবে না।মরতে হবে ভিক্ষে না করার আফসোস নিয়ে।
যে যেখানে পারছে কানে হেডফোন লাগিয়ে ক্যামেরার সামনে দাড়িয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দেশবাসীকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাচ্ছে। "দর্শকবৃন্দ,এই ছিলো গুলশানের সর্বশেষ পরিস্থিতি।আরও খবরের জন্য আমাদের সাথেই থাকুন। "
দেশবাসীর সাথে সাথে জঙ্গিবাদীরাও বিল্ডিং এর ভেতরে বসে বাইরের সর্বশেষ পরিস্থিতি দেখছে টিভিতে।
একজন সংবাদ পাঠিকা এক র্যাব সদস্যের সাক্ষাতকার নিচ্ছে।
-আপনারা কোনদিক দিয়ে ঢুকবেন বলে ভাবছেন।
-আসলে আমরা ট্যাংক আনার ব্যবস্থা করেছি।ইতিমধ্যেই সোয়াট চলে এসেছে।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বিল্ডিং এর পেছনের দেয়াল ভেঙে ঢোকার ব্যবস্থা করবো।
বাংলাদেশ পুলিশের ড্রোন না থাকলেও নিউজ চ্যানেলগুলোর আছে।সেই সব ড্রোন বিল্ডিং এর বিভিন্ন কোণায় কোণায় উড়ে বেড়াচ্ছে।বাদলদের বাসায় একবার ডিসকভারী নামের চ্যানেলে দেখেছিলাম (বাদলদের বাসায় টিভিতে ডিসকভারী ছাড়া আর কোনো চ্যানেল কখনো চলে না) কি একটা ফড়িং এর সমান প্লেন থেকে ইঞ্জেকশন দিয়ে চার পায়ে খাড়া চিতা,মাটিতে সটান হয়ে যাচ্ছে।
বাঘকে অবশ করা গেলে মানুষকেও করা যায়। ফড়িং এর সমান একটা ড্রোনে যদি একটা anasthetic drug injection দিয়ে বিল্ডিং এর ভেতরে পাঠিয়ে সব কটা জঙ্গিকে অবশ করে দেয়া যেতো,কাজটা সোজা হয়ে যেত।
"লাগ ভেলকি লাগ। " আব্বাস মিয়া বিড়বিড় করলো আপন মনে।
আমি ক্যামেরা ম্যানের কাছে যেয়ে দাড়ালাম। গায়ে দুটো টোকা দিতেই আমার দিকে ঘুরলেন।
-ভাই সাহেব একটু সাইডে আসেন।কথা আছে। ক্যামেরাম্যান কাছুমাছু মুখ করে পেছনে পেছনে আসলো।
-শোনেন ভাই সাহেব, আমি পুলিশের লোক।আমাকে ট্যাক্স নেয়ার জন্য এখানে রাখা হয়েছে।প্রতি ক্যামেরাম্যান ৫০০ টাকা। নাহলে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া হবে।
পুলিশকে শুধু হিমুরা ভয় পায় না।বাকি সবাই ভয় পায়। ক্যামেরা ম্যান পকেট হাতাচ্ছেন। আমি অন্য ক্যামেরা ম্যানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ক্যামেরা ম্যানরা লাইভ থেকে একটু বিরতিতে যাক। পুলিশ র্যাব ভাইরা একটু লাইভে আসুক।ওনাদের লাইভে আসা এখন বেশি দরকার।
সাংবাদিক ভাইদের দুই একটা সাক্ষাতকারও আজকে দিয়ে দেবো ভাবছি।আব্বাস মিয়ার লুঙ্গির কোঁচায় আজকে থাকবে সব ৫০০ টাকার নোট।পুলিশকে সবাই
ট্যাক্স দেবে।কেউ মাইন্ড করবে না।








