১৯৭১ সালের মার্চ মাসের কোন একদিন.
--নিরব অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র।
--গ্রাম থেকে এসে শহরে মেছে
থাকে।
--নিরব তার মেছে একা একা বসে
আছে।
--সামনে তার পরীক্ষা কিন্তু সে বিষয়
নিয়ে
তার কোন টেনসন নাই।
--সে নিশ্চিন্তে বসে বসে কি নিয়ে
যেন
ভাবতেছে।
--এমন সময় তার বন্ধু ইমরান আসল।
--ইমরানও গ্রামের ছেলে সে এসেছে
নিরবদের
পাশের গ্রাম থেকে।
--ইমরান এসে বলল কিরে নিরব এমন
ভাবে বসে আছিস
কেন।
--নিরব বলল কিভাবে বসে আছি।
--এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছিস।
--কিছু হয় নাই এমনি এমন ভাবে বইসা
রইলাম।
--কিছু না হইলে তুই এমন ভাবে বইসা
আছস কেন?
--মনটা কয়েক দিন ধরে অনেক খারাপ।
--কেন পরীক্ষা নিয়ে টেনশনে আছিস।
--পরীক্ষা নিয়ে কোন টেনশন করতেছি
না।
--তা না হলে কি জন্য মন খারাপ।
--মন খারাপ দেশের অবস্থা নিয়ে।
--দেশের আবার কি হল দেশের অবস্থা
নিয়ে
ভাবছিস তাই মন খারাপ।
--কিছু হয় নাই কিছু দিনের মধ্যে একটা
বড় কিছু
হবে।
--কি হবে একটু বুঝিয়ে বল।
--দেশের মধ্যে পাকিস্তানিরা এখন
আমাদের ওপর
অনেক বেশি নির্যাতন করতাসে কিন্তু।
--এটা আর নতুন কি অনেক আগে থেকেই
তারা
বাংলাদেশকে শোষন করতেছে।
--জানি দেখ কয়ক দিন ধরে আশে-
পাশে মানুষগুলো
কিভাবে জেগে ওঠতাছে দেখতাসস।
--দেখতাসি কিন্তু কোন কাজ হইব না।
--হইব দেখিস আমরা ও একদিন স্বাধীন হমু
আর
পাকিস্তানিদের অত্যাচার থেকে
মুক্তি
পামু।
--আর যদি কোন সময় দেশ স্বাধীন হইবার
ডাক পরে
সবার আগে আমি যামু।
--আচ্ছা যাওয়া যাওয়ি পরে দেখা
যাইব এখন চল
বাহির থেকে ঘুরে আসি।
কিছুদিন পর রাতে
.
রাতটা ছিল ২৫শে মার্চের রাত
.
--ইমরান আর নিরব ঘুমাইতেছে হঠাৎ
কিসের শব্দে
যেন ঘুম ভেঙ্গে যাই।
--চারদিকে বোমা ফাটার
আওয়াজ,কামান
বন্দুকের আওয়াজ আরো অনেক কিছুর
আওয়াজ
ভেসে আসতেছে বাতাস দিয়ে।
--ইমরান নিরবকে জিজ্ঞাস করল কিরে
কি হ
ইতেছে এমন আওয়াজ আ ইতেছে কেন?
--নিরব বলল হয়ত পাকিস্তানিরা পাগল
হয়ে গেছে
তাই।
--পাগল হয়ে গেছে মানে!
--মানে কিছু না আমি তকে বলছিলাম
আমাদের
মুক্তির দিন কাছে এসে পরছে।
--হ্যা বলছিলি কিন্তু এখন এই বোমা
কামানের
শব্দের সঙ্গে তার সম্পর্ক কি ?
--আছে দেখ তারা এখন পাগল হইয়া
গেছে বেশি তাই
তারা বাঙ্গালিদের ওপর অত্যাচার
করতেছে
বেশি আর এই অত্যাচার তাদের ধ্বংস
ডেকে
আনবে।
--আচ্ছা এখন ঘুমা সকাল হইলে দেখা
যাইব আসলে ঐ
শব্দ গুলা কিসের ছিল।
--আচ্ছা চল ঘুমাই।
.
২৬শে মার্চ সকালে
.
--নিরব আর ইমরান ঘুম থেকে উঠে
মেছের বাহিরে
গেল রাতে কি হইছে তা দেখার জন্য।
--কিরে এসব কি চারদিকের পরিবেশ
চিনায় যাই
না।
--রাতে তারা এমন ভাবে আমাদের
বাঙ্গালি
জাতির উপর হামলা চালাইছে আমরা
কিছু করতে
পারলাম না।
--কিছুক্ষন পর তারা মেছের দিকে
হাঁটা শুরু
করল এমন সময় একটা দোকানের মধ্যে
রেডিওতে কি
যেন শুনে দাড়িয়ে পরল।
--তারা রেডি ওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষন
শুনতে পেল।
--বঙ্গবন্ধু সবাইকে যুদ্ধে নামার জন্য
আহবান
জানাইতেছে।
--বঙ্গবন্ধু বলতেছে যার কাছে যা আছে
তা নিয়ে
আপনারা নেমে পড়ুন।
--এখন দেশকে স্বাধীন করার এবং
নিজেকে
স্বাধীন করার সময় এসে গেছে।
--তিনি আরও বললেন 'এবারের সংগ্রাম
মুক্তির
সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম
স্বাধীনতার
সংগ্রাম।
--এইভাবে তিনি আর অনেকক্ষন ভাষন
দিলেন।
--ভাষন শেষে মনে হল ভাষন এত
তারাতারি শেষ
হয়ে গেল।
--তারপর তারা দুই জন মেছে চলে গেল
এবং দুই জন
সিদ্ধান্ত নিল তারা দুই জন যুদ্ধে
যাবে
দেশকে স্বাধীন করবে।
--তখন তারা সেই ভাষন শুনে মুক্তিযুদ্ধ
কেম্পের দিকে গেল যুদ্ধের ট্রেনিং
নেওয়ার
জন্য।
--ট্রেনিং নিয়ে আসতে আসতে প্রায়
১০ দিন
লাগল।
.
১২ এপ্রিল
.
--তারা যুদ্ধে অংশ গ্রহন করল।
--যুদ্ধে আসার আগে নিরব একটা ডাইরী
নিয়েছিল
যুদ্ধের অনুভূতি লিখার জন্য।
--সে তার ডাইরিতে লিখল আজ প্রথম
যুদ্ধে অংশ
গ্রহন করলাম।
--জানি না কয় দিন বেচে থাকব যতদিন
বেচে থাকব
ততদিন যুদ্ধ করে যাব দেশকে স্বাধীন
করে
ছাড়ব।
--এই বলে সে যুদ্ধে গেল।
.
১৫ মে
.
--অনেক দিন পর নিরব আবার তার
ডাইরি তে লিখতে
বসল।
--যুদ্ধ শুরু হয়েছে আজ অনেক দিন হল
অনেক
মানুষ চোখের সামনে মারা গেল এবং
অনেককে
মারলাম।
--যারা মারা গেছে তাদের সেই মুখ
গুলো চোখের
সামনে ভেসে ওঠতেছে।
--তাদের জন্য অনেক কষ্ট হয়তেছে।
--অনেকটা সময় কাটিয়েছি তাদের
সঙ্গে তাই
অনেক কষ্ট হচ্ছে তবু আমরা পিছপা হব
না।
.
১২ জুলাই
.
--কিভাবে সময় টুকু কেটে যাচ্ছে কেউ
বলতে
পারে না।
--যুদ্ধের মধ্যে অনেক দিন না খেয়ে
কাটিয়েছি।
--কোন সময় ভাবি নাই এমন সময় আসবে
না খেয়ে
কাটাতে হবে।
--অনেকদিন শুধু পানি খেয়ে
কাটিয়েছি।
--অনেক সময় ৩-৪ দিন না ঘুমিয়ে
কাটিয়েছি।
--তবু কষ্ট হয় না।
--আমাদের যিনি নেতৃত্ব দিতেন আজ
তিনি
শত্রুর গুলি খেয়ে মারা গেছেন।
--তিনি ছিলেন একজন আর্মি অফিসার
আর আমাদের
২০ জন দলের একটা টিমের হেড।
--ওনাকে বাচাতে নিরব অনেক
চেষ্টা করল।
নিজের বুকে একটা গুলি ও খেল কিন্তু
ওনাকে
বাচাতে পারল না।
--এখন নিরব গুরুতর ভাবে অসুস্থ।
--আমাদের যিনি নেতৃত্ব দিতেন
তিনি মারা
যাওয়ার পর নেতৃত্ব নিরব দিবার কথা
কিন্তু
সে অসুস্থ থাকার জন্য নেতৃত্ব দেওয়া
লাগতেছে আমার।
--জানি না পরব কিনা সবাইকে নেতৃত্ব
দিতে।
এই কথা গুলো ইমরান একা একা
ভাবতেছে আর
চোখের পানি ফেলতেছে।
.
০৬ সেপ্টেম্বর
.
--আজ নিরব আবার তার ডায়েরি
লিখতে বসল।
--মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে অনেকের
সাথে
পরিচয় হয়। আজ তাদের মধ্যে থেকে
অনেকে নেই
দেশের জন্য নিজের প্রাণ দিয়ে
দিয়েছে।
সর্বপ্রথম আমরা ছিলাম ২০ জন এখন আছি
মাত্র ১০
জন বাকিরা সবাই শহীদ হয়ে গেছে।
--আজ আমরা ব্রাহ্মনবাড়িয়াতে আসছি
পাক
বাহিনির একটা ঘাঁটি নষ্ট করতে।
--ব্রাহ্মনবাড়িয়াতে শুধু এই ঘাঁটিটা
আছে বড়
আর ছোট খাটু অনেক আছে যেগুলা
বাকিরা শেষ
করে ফেলতে পারবে।
--যে ঘাঁটিটা আমরা ধ্বংস করতে
এসেছি এইটা
ব্রাহ্মনবাড়িয়ার সদর থানাই উপস্থিত।
--এইটা ধ্বংস করার জন্য জীবনের অনেক
রিস্ক
নিতে হবে।
--আজ রাতে আমরা আক্রমন করব সেই
ঘাঁটিতে হয়
মরব না হয় মারব।
--আমাদের কাছে তাদের সাথে
মোকাবেলা করার
এত বেশী অস্ত্র নাই তবু আমরা আমাদের
কাছে
যা অস্ত্র আছে তাই নিয়ে এসেছি।
--সন্ধা হয়ে আসতেছে এখনি বের হতে
হবে সেই
ঘাঁটিটা ধ্বংস করার জন্য।
--এই টুকু লিখে নিরব তার ডায়েরি বন্ধ
করল এবং
চলে গেল যুদ্ধের ময়দানে।
.
১৬ ডিসেম্বর
.
--অনেককে হারিয়ে আজ আমরা
স্বাধীন হলাম।
--আজকে আমাদের কাছে পাক
বাহিনিরা হার
মানল।
--যাদের হারিয়েছি তাদের জন্য
অনেক কষ্ট
লাগতেছে আবার মুক্তির আনন্দে অনেক
ভাল
লাগতেছে।
--আমাদের দলের ২০ জনের মাঝে এখন
মাত্র আমরা
৬ জন আছি। বাকিরা বিভিন্ন মিশনে
মারা
গেছে। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার মিশনে ২ জন
মারা
গেছিল শত্রুর গুলি খেয়ে।
--আমাদের মধ্যে একজন আমাদের শেষ
মিশনে তার
পা হারিয়ে ফেলেছে। তবু তার মনে
কোন কষ্ট
নাই কারন এখন থেকে কারো কথাই
আমাদের চলতে
হবে না আমাদের ওপর কেউ আর জুলুম
অত্যাচার
করবে না তাই অনেক খুশি।
--আমাদের আশে পাশে এখন অনেক
মানুষ আছে
যাদের মধ্যে অনেকে তাদের
ভাই,বাবা,কাকা,ব
ন্ধু হারিয়েছে। তারা এখানে সেই
হারানো
মানুষদের খুঁজতে এসেছে আর পাক
বাহিনিদের
প্রতি তাদের যে ঘৃণা তা জানাতে
এসেছে।
--তবু আজ সবাই খুশি আজ সবার চিৎকার
করে বলতে
চাইতেছে ''আমরা বাঙ্গালী, আমরা
বাঙ্গালী ,
আমরা আজ থেকে স্বাধীন আমরা আর
পরাধীন নয়






0 মন্তব্য:
Post a Comment