মানিব্যাগ আতিপাতি করে খুজেঁ সব ভাংতি টাকা মিলিয়ে দেখলো মাত্র একশো বিশ
টাকা আছে আকাশের।মাস শেষ হতে এখনো দশদিন বাকি,ততদিন এই টাকা দিয়ে ই চলতে
হবে ওর,মেস ভাড়াও দিতে হবে।যদিও এটা নিয়ে ও তেমন একটা ভাবে না।
দশদিন কিভাবে চলবে এটা ভাবতে ই একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো ওর বুক চিড়ে।
টিউশনি থেকে কাল বেতন ও,,,, পেয়েছে,তাও গতকাল ও নিরবের হাতে তুলে দিয়েছে
ওর মায়ের ঔষধ কেনার জন্য,নিজে কিভাবে চলবে সেটা একবারও ভাবে নি।
.
নিরবদের বাসায় যাওয়া দরকার।কাল টাকা দিয়ে ঔষধ কিনে দেয়া উচিত ছিলো,কিন্তু
একটা কাজ থাকায় সেটা আর পারে নি।তাই আজ যাচ্ছে খোঁজখবর নিতে।তাদের মত
গরীবদের কেউ আপন ভাবে,খোঁজখবর নেয় এটা তাদের কাছে অনেক কিছু।সম্পর্ক কখনো
ধনী গরীব দেখে হয় না।রক্তের সম্পর্ক না থাকার পরেও অনেক সময় কিছু মানুষকে
খুব কাছের বলে মনে হয়,মনে হয় তারা যেন কত আপন,কত দিনের পরিচয় তাদের
সাথে।একটা অদৃশ্য বাধনে যেন বাধাঁ আছে তাদের সম্পর্ক টা।
.
নিরবের
সাথে আকাশের পরিচয় হয় একটা পার্কে,সেখানে ও ফুল বিক্রি করে মানুষের
কাছে।সেদিন সাদিয়ার সাথে ব্রেকআপের জন্য আকাশের মন খারাপ ছিলো।বড়লোক বাবার
মেয়ে সাদিয়া,কিভাবে যেন ওরসাথে সম্পর্ক টা হয়ে যায় আকাশের।আকাশ মেয়েটাকে
এড়িয়ে চলতে চাইলেও মেয়েটা বারবার ওরকাছে আসতো,খোঁজখবর নিতো।আকাশ চাইতো না
কেউ ওর এই ছন্নছাড়া জীবনে আসুক,নিজেকে অনিশ্চিয়তায় ফেলুক।তাই মেয়েটা কি চায়
তা জেনেও না জানার ভান করে থাকতো।
কিন্তু একসময় ধরা দিতে বাধ্য হয়,যদিও আকাশ জানতো এই সম্পর্ক বেশীদিন টিকবে না।
হ্যঁ ওর ধারনা ই ঠিক ছিলো।সাদিয়ার মোহ টা কাটতে ই ও আকাশকে ছেড়ে চলে
যায়,যাওয়ার আগে বলে যায় তার চাইতে ভালো কাউকে সে ডিজার্ভ করে,সে আর এই
সম্পর্ক রাখতে চায় না।
নিজের ক্যাটাগরির কাউকে খুজে নিতে বলে, সাথে আরো
অনেক কিছু বলে চলে যায় সাদিয়া।সেদিন আকাশ একটুও কাদেঁ নি।শুধু নীরবে ওর
চলে যাওয়ারা দেখেছিলো আর সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিয়েছে ওদের একসাথে কাটানো
মুহুর্তগুলির কথা ভেবে।জীবনে সবাই সবকিছু পায় না
,সব পেতে নেই।নাইলে জীবনটা অনেক পানসে মনে হয়।
.
সেদিন যখন ও বসেছিল তখন একটা ছেলে এসে ওকে বলে...
---ভাইজান একটা ফুল নিবেন?
---ফুল দেয়ার মত কেউ নেই রে,ফুল নিয়ে কি করবো বল।
---নেন না ভাইয়া,সবচেয়ে ভালা ফুলটাই দিমু আপনারে।
---সব ফুল ই এক।পার্থক্য শুধু রঙ ও গন্ধে।কিছু ফুলের সৌরভে আমরা বিমোহিত হই,আর কিছু ফুলের সৌন্দর্যে আমরা অভিভূত হই।
---নেন না ভাইজান,আজ সারাদিনে একটা ফুলও বিক্রি হয় নাই,আজ ফুল বিক্রি না হইলে না খাইয়া থাকতে হইবো আমার আর আমার অসুস্থ মায়ের।
---তোর মা অসুস্থ?
---হা ভাইজান।আজ তিনদিন ধইরা মায়ের অনেক জ্বর,ডাক্তার দেহামু সেই টাকাও
নাই,মায় মাইনষের বাসায় কাম করে,কিন্তু জ্বরের লাইগ্গা কামে যাইতে পারে
না,কাল থেইক্কা ঘরে চাল নাই,আজ সকাল তে পানি ছাড়া আর কিছু খাই নাই।
বলে
ছেলেটা কেদেঁ দেয়।ছেলেটার দিকে চেয়ে ওর মায়া হয়।পৃথিবীর নিয়মটা বড়
অদ্ভুদ।কেউ খাবার অপচয় করে, তো কেউ খাবারের অভাব উপোষ থাকে।কেউ পায়ের উপর
পা তুলে বৈধ অবৈধ উপায়ে টাকা কামিয়ে টাকার পাহাড় গড়ে তোলে,তো কেউ মাথার ঘাম
পায়ে ফেলে দুবেলা দুমুঠো খাবার জন্য।
.
সেদিন ওর কথা শুনে আকাশের মায়া হয়।তাই ওরসাথে গিয়ে ওর মা কে দেখে আসে,সাথে কিছু টাকাও দিয়ে আসে।সেই থেকে নিরবের সাথে ওর পরিচয়।
নিরব রাস্তায় রাস্তায়
ফুল বিক্রি করে, রাতে ঘুমায় কমলাপুর রেল লাইনের পাশে বস্তিতে।
পকেটে যেদিন টাকা থাকে, নিরব ও তার মায়ের জন্য
কিছু খাবার কিনে নিয়ে যায় আকাশ।
হোক কম দামী। তবুও বেশ খুশি হয়
নিরব।ওর বাবা নেই,কখনো দেখেনি তাকে,
মা সারা বছর ই অসুস্থ
থাকে,এই অসুস্থ শরীর নিয়েও মানুষের বাসায় কাজ করেন তিনি।গরীব
হয়ে জন্মাল। অসুখ বিসুখ বাধাবার
কি দরকার? কাজ করবে ,খাবে, এক সময়
হুট করে মরে যাবে। এই তো গরীব মানুষের
জীবন হওয়া উচিত ছিল। না অসুস্থ হবে, স্বপ্ন দেখবে,
আবার আকাশের মত কিছু বেকুব গোছের
কেউ, প্রেম করার জন্য কাউকে ভালও
বাসবে। এসব দিয়ে লাভ নেই।
বেঁচে থাকাই কথা। মা অসুস্থ থাকাতে,
সব করতে হয় নিরবের। ফুল বিক্রি করে,
জ্যামে থাকা গাড়িতে,
পার্কে পার্কে থাকা কাপলদের কাছে।
সেদিন পার্ক থেকে ওদের বাসায় যাওয়ার পর থেকে নিয়মিত ই নিরবের বাসায়
আসে,অসুস্থ জেনে নিরবের মায়ের জন্য মাঝে মাঝে ওষুধও নিয়ে আসে,খাবারও আনে
মাঝে মাঝে।টুকটাক যতটুকু পারে সাধ্যনুযায়ি সাহায্য করে।
আকাশকে পরিবারের একজন ভেবে বসে আছে নিরব
আর নিরবের মা। মায়া বাড়িয়ে দেয়
মাঝে মাঝে নিরব,ভাইয়া ডেকে।
মায়া বাড়িয়ে দেয় নিরবের মা,
মাঝে মাঝে আকাশকে বাবা বলে ডেকে।তখন খুব
মনে পড়ে মায়ের কথা,বড়
বোনটার কথা।বোনটার বিয়ে হয়েছে
৩ বছর।ওর দুলাভাই ওকে দেখতে পারেন না কোন কারনে,তাই ওর বোনকে দেখতে যেতেও
পারে না।মাঝে মাঝে ওর বোন খোঁজখবর নেয়,কিন্তু গোপনে।আকাশ সব ই বুঝে,নিন্ম
মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা বুঝ হবার আগে ই অনেক কিছু বুঝে যায়,নিজেদের
চাওয়া পাওয়া ও স্বপ্ন গুলোকে সীমাবদ্ধতার ভেতর ই রাখে,উড়তে দিতে চায় না
বিশাল আকাশে,যদি হারিয়ে যায়?? মা হুট করে মরে গেলেন।
মায়া থেকে বাঁচতে চাইলেন। পারলেন
কিনা জানে না আকাশ। আকাশের চোখ
ঝাপসা হয়ে আসছে। আর ভাবতে চায় না।
মায়া বড় খারাপ জিনিস।
.
সেদিন সকালে নিরবদের বাসায় যায় আকাশ,বাইরে থেকে নিরবকে ডাক দেয়।আজ নিরব
কাজে যায় নি, বাইরে এসে আকাশকে দেখে নিরব খুশি হয়,হাত ধরে ঘরের ভেতর নিয়ে
যায়।ভেতরে গিয়ে আকাশ ওর মার অসুখ এখন কেমনঔষধ এনেছে কি না,ঠিকমতো খাচ্ছে কি
না এসব জিজ্ঞেস করে।নিরবের মা মাথা নেড়ে সায় দেন,আকাশ ওরকাছে থাকা একশো
বিশ টাকা থেকে একশো টাকা নিরবের মায়ের হাতে তুলে দেয়।অশ্রুতে নিরবের মায়ের
চোখ ভিজে যায়।আকাশকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করেন ওরজন্য।আকাশের
চোখও ভিজে আসে।তাড়াতাড়ি ও বাইরে চলে আসে,নিজের চোখের পানি ও কাউকে দেখাতে
চায় না।
.
দুপুরে ভীষণ ক্ষুদা লাগে আকাশের।একটা হোটেলে গিয়ে ও ওয়েটার কে জিজ্ঞেস করে......
--- ভাত হবে?
---হ্যাঁ হবে।
--- সাথে কি কি আছে?
---রুই,ইলিশ, বোয়াল, শোল, গরু, মুরগী।
---আর কিছু নাই?
---ডিম আছে।
---আলুর ভর্তা নাই?
---আছে।তবে গতকালকার।দিমু??
--- দাম কত?
---৫ টাকা।
---ভর্তা তো বাসি,দু টাকা বেশী দিলে কি সাথে ডাল দেয়া যাবে একটু??
---অল্প একটু দেওন যাইবো।
---আচ্ছা, ভর্তা ভাত আর একটু ডাল
দেন।
.
একটু পর ওয়েটার এসে ভাত, বাসি আলু
ভর্তা আর ডাল দিয়ে যায়,
সেগুলো একসাথে মেখে খাচ্ছে আকাশ। একটু একটু টক লাগছে, ওটা ব্যাপার না। ১২
টাকায় দুপুরে পেট ভরে খাওয়া হয়ে গেল। বেশ তো। ফিল্টার পানি খেলে আলাদা টাকা
দিতে হবে। এর
চেয়ে জগ ভর্তি পানি, ঢক ঢক
করে খেয়ে ফেলল। তৃপ্তি নিয়ে খেয়ে, বিল
মিটিয়ে বের হয়ে আসল আকাশ।
পকেটে এখন ৮ টাকা আছে।মেসে গিয়ে রোহানের কাছ থেকে আবারো কিছু টাকা ধার নিতে হবে।রোহান ছেলেটা অনেক ভালো। টাকা পয়সা চাইলেই দিয়ে দেয়।
ওর থেকে কত টাকা যে নিলো আকাশ, হিসেবও রাখে না।
হয়ত কখনও শোধ করা হবে না।রোহান ফেরত
চায় তাও না।
আকাশকে প্রায় ই বলে,,
---বন্ধু, তোর টাকা পয়সা কখনও ধার লাগলে আমার থেকে নিয়ে যাস।
আকাশ দুদিন পরপর ই রোহানের কাছে গিয়ে বলে.....
----বন্ধু, খুব বিপদে পড়েছি,টিউশনির টাকাটাও এখনো পাই নি,,কিছু টাকা ধার
দিতে পারবি?
নিরবের মায়ের জন্য ঔষধ কিনতে হবে।
রোহান ওর মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে আকাশের দিকে বাড়িয়ে দেয়। আকাশ টাকা নিয়ে চলে যায়।
দুদিন পর আবারো বলে......
----বন্ধু আবার কিছু টাকা দিতে পারবি?টিউশনির টাকাটা পেলে ই দিয়ে দিবো।
রোহান আবারো মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে এগিয়ে দেয়,এবার একটু বেশি টাকা ই দেয় আকাশকে।
আকাশ নির্লজ্জের মত বেশি করেই
নিয়ে নেয় টাকা।রোহান ক্লাসের
সবচেয়ে ভাল ছাত্র ছিল, পাস করেই
চাকরি পেয়ে গেল। ভালো বেতনে চাকরি।
আর আকাশ পাস করার পর থেকেই
বেকার,একটা টিউশনি করে কোনমতে চলে। কয়েক জায়গায় চাকুরীর চেষ্টা করলো,সিভি জমা দিল। কিন্তু ওর জঘন্য
রেজাল্ট দেখে, আর ডাকে না কেউ। তাই
টাকা লাগলে রোহান ই ওর ভরসা।
ওর রক্তের কেউ নয়,, তবুও আকাশের জন্য কত
করছে। তবে ইদানীং রোহানের কাছে টাকা চাইতে খুব
অস্বস্তি লাগে ওর। একজনের থেকে আর
কত
নেয়া যায়? রোহানের পরিবারের অবস্থাও বেশী ভালো নয়।
পরিবারে টাকা পাঠায়। নিজে ঢাকায়
চলে ফিরে,মেস ভাড়া নিজেরটা আর ওরটা রোহান ই দেয়,,আবার
আকাশকে টাকা দেয়। এভাবে চলে না, আসলেই চলে না।
সংকোচ লাগে খুব। তাই
কিন্তু টাকা দরকার হয়।তাই ইচ্ছে না থাকলেও ওর কাছে চাইতে হয়।
.
বরাবরের মতো আজও আকাশ ওরকাছে এসে টাকা ধার চাইলো।রোহানও মানিব্যাগ থেকে
টাকা বের করে বাড়িয়ে দেয়,টিউশনির টাকা পেলে শোধ করে দিবে কথা দিয়ে আকাশ
টাকা নিয়ে বেড়িয়ে যায়।রোহান হাসে,ছেলেটা বড্ড সহজ সরল,তাই তো ভার্সিটি শুরু
থেকে আজো ওদের বন্ধুত্বটা টিকে আছে।আকাশের সবকিছু ই জানে রোহান।
আকাশ বন্ধু হিসেবে অনেক ভাল। এতো ভালো বন্ধু পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।
আকাশকে রোহান টাকা দিচ্ছে সাহায্য
করার জন্য নয়,,,ঋণ শোধ করার জন্য।
যদিও এই ঋণ সারাজীবনেও শোধ
করা যাবে না এটা রোহান ভালো করে ই জানে। তবুও যে টুকু
পারে চেষ্টা করে ঋন শোধ করতে।কারন এই আকাশ যদি সেদিন সাহায্য না করতো তাহলে আজ রোহানের চাকুরী করা হতো না।
অতীতে ফিরে যায় রোহান.......
.
ভার্সিটির শেষ সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষা।
রেজিস্ট্রেশন করতে বেশ কিছু
টাকা দরকার। রোহান কোন ভাবে ই যোগাড়
করতে পারছে না।ওর বাবা অসুস্থ, তার চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে,জমিজমা
সব বন্ধক রাখতে হয়েছে।দুটো টিউশনি করে রোহান,মাস শেষ হয়নি বলে বেতনও পায়
নি,এদিকে ছোট বোনের পরীক্ষার ফি দেয়ার সময়ও ঘনিয়ে আসছে।কি
করবে তা ভেবে পায় না রোহান। ক্লাসের ভাল ছাত্র সে,শেষ
মুহূর্তে কি পরীক্ষা দিতে পারবে না সে?এত বছরের সাধনা কি বিফলে যাবে??
এসব ভেবে সেদিন কান্না করে রোহান।অত বড়
ছেলেটা
রুমে এসে আকাশকে জড়িয়ে কাঁদে,পুরো ভার্সিটিতে আকাশ ই ওর একমাত্র বেষ্টফ্রেন্ড।।অনেকের কাছে টাকা চেয়েছে,কিন্তু পায় নি রোহান।
আকাশের মনও খারাপ। ওর বাবা নেই,,মা অনেক দিন
ধরে অসুস্থ। প্রতি মাসে ভালো
অঙ্কের
টাকা লাগছে। আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার দেনা আর টিউশনির
টাকা দিয়ে চিকিৎসা চলে মায়ের।রোহান এসে ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে,, সাহায্য
করতে পারে না আকাশ। টাকা নেই ওর
কাছে। যা আছে এই সপ্তাহে মায়ের
জরুরী কিছু ঔষধ কেনা লাগবে। কিছু বলে না আকাশ,,রোহানকে কাঁদতে দেয়।
.
পরদিন সকালে রোহানের
হাতে টাকা ধরিয়ে দেয় আকাশ। বলে ,
---যা জলদি রেজিস্ট্রেশন করে আয়।
---তুই টাকা কই পেলি?তোর কাছে তো টাকা নেই।
---কথা কম বল,এখন যা।
রোহান চলে যায় জলদি। রেজিস্ট্রেশন
করে আসে। এই বন্ধু ওকে এতো বড় সাহায্য
করবে,এই বিপদে ওর পাশে থাকবে এটা ও ভাবতে পারে নি।
রোহান কি করবে ভেবে পায় না।
এসে জড়িয়ে আবার কাঁদে আকাশকে।
আকাশ বলে
----ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট
হওয়া চাই,আর হ্যঁ সাথে পেটভরে মিষ্টিও খাওয়াতে হবে কিন্তু।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার পাচঁদিন পর খবর আসে আকাশের মা মারা গেছেন।পরীক্ষা
থাকায় রোহান আকাশের মায়ের জানাজা ও দাফনে যেতে পারে না। আকাশ পরীক্ষা বাদ
দিয়েই চলে যায়।
মায়ের কাফন-দাফন শেষ করে দশদিন পর আকাশ ফিরে আসে।আকাশ ফিরে আসার পর রোহান
জানতে চায় আন্টি কিভাবে মারা গেছেন?আকাশ বলে না কিছু,, চুপ করে থাকে।
রোহান জোরাজুরি করে,তবুও আকাশ বলে না।
এড়িয়ে যায় বারবার।একদিন রোহান আকাশকে বলে যদি আজ ও সত্যি কথাটা না বলে
তাহলে আজ ই ওদের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যাবে।রোহানের কথায় এমন কিছু ছিলো যা
আকাশকে সব সত্যি বলতে বাধ্য করে।রোহানকে আকাশ বলে.....
----এই
সপ্তাহে মায়ের ঔষধ দেয়া হয় নি।শ্বাসকষ্টটাও বেড়ে গিয়েছিলো।
হয়ত তাতেই। মা বার বার বলছিল,
এক সপ্তাহ ঔষধ না খেলে কিছু হবে না।
সব শুনে রোহান নিশ্চুপ হয়ে যায়। ঠিক বুঝে ফেলে,
ওর মায়ের ওষুধের টাকা দিয়ে দিয়েছিল রোহানকে রেজিষ্ট্রেশন করার জন্য।
রাগে ক্ষোভে আকাশকে একটা থাপ্পড়
মারে রোহান।থাপ্পড় খেয়ে আকাশ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।রোহান ওকে বলে....
----তুই আমায় টাকা দিলি কেন? তোর
মায়ের ঔষধের চেয়ে কি আমার
পরীক্ষা দেয়াটা জরুরী ছিল?কেন করলি এমনটা?বল।
আকাশ ছলছল চোখে বললো.....
----মা তোকে নিজের সন্তানের মতো ভাবতো এটা তুই আগে থেকে ই
জানিস।রেজিষ্ট্রেশন করার সময় মা তোর কথা জানতে চায়,টাকার জন্য তুই
রেজিষ্ট্রেশন করতে পারছিস না শুনে
মা বলল, তোকে টাকাটা দিতে,,এক
সপ্তাহ ওষুধ না খেলে কিছু হবে না।
----তুই আন্টিকে ওসব
কথা
বলতে গেলি কেন?
----আমার পরিবারের পর সবচেয়ে আপন কেউ থাকলে সে হলো তুই।তোকে বন্ধু না,আপন ভাই ভাবি আমি।তাই।
রোহান আর কিছু বলে না,বলতে পারে না।ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে।আকাশের মাকে রোহান নিজেই খুন
করলো। হয়তো অসুস্থতা থেকে তিনি মারা গিয়েছেন,
তবুও রোহান মানতে পারে না।নিজের মনকে বুঝ দিতে পারে না
মায়ের আত্মত্যাগ আর অকৃত্রিম বন্ধুত্বের জন্য এখনো আকাশের পাশে ছায়ার
মত আছে রোহান, চেষ্টা চালাচ্ছে আকাশের চাকরি যোগাড় করে দেবার,
চেষ্টা করে আকাশের সব
চাহিদা মেটাবার। চেষ্টা করছে ঋন খানিক
হলেও শোধ করবার।কখনো এই ঋন শোধ করতে
পারবে না,,, জানে রোহান। এই ঋণ শোধ
করার নয়,শোধ করা যায় না এই ঋন।
.
রোহানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আকাশ বাইরে বের হয়।রাতে শুধু একটা পাউরুটি
খেয়েছে,ক্ষুদায় পেট জ্বলছে।পেটভরে ভাল মন্দ খাওয়া হয় না অনেকদিন ধরে,আজ
পেটভরে খাওয়া যাবে।পরক্ষনে ই ভাবে ধুর
পেটভরে খেয়ে কি হবে?এভাবে ই
ভালো,বেশী খাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেলে পরে টাকা কই পাবে?ওর মতো মানুষদের সবসময়
হিসাব করে চলতে হয়।বিলাসিতা ওর মতো নিন্ম মধ্যবিত্তেকে মানায় না।
নিরবের মা অনেক অসুস্থ।তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে,সেদিন নিরব
বলেছিল ওর মা নাকি প্রায় ই বলে আমার কিছু হলে তোকে কে দেখবে,,,।এটা শুনে
আকাশের চোখটা ঝাপসা হয়ে যায়।এই টাকা দিয়ে ওর মাকে ডাক্তার দেখাতে
হবে।নিরবের মা বেঁচে থাকবে।
আকাশের মায়ের মত হারিয়ে যাবে না।একজন মা
বাঁচবে।তার মাঝে যেন নিজের মায়ের ছায়া খুজেঁ পায়,আচ্ছা পৃথিবীর সব মায়েরা
কি এমন?মায়ার বাধঁনে জড়িয়ে রাখে সর্বক্ষণ।
আকাশকে টাকা দিয়ে সাহায্য করে রোহান ঋণ শোধ
করতে চায়,ভারমুক্ত হতে চায়।আর
অপরাধী হয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে না।
তাই প্রতিনিয়ত কিছু অভিনয় করে যাচ্ছে বন্ধুর সাথে। এই অভিনয়ে,ক্ষতি নেই। এই
অভিনয়ে ভালবাসা বাড়বে।
বেঁচে থাকবে একজন মা।
.
আমরা সবাই ই অভিনয় করি, প্রতিনিয়ত বেচেঁ থাকতে অভিনয় করি।জীবনটা একটা রঙ্গমঞ্চ,আমরা সবাই ই অভিনেতা।
কখনো ভালবাসার অভিনয় করি, ভালো থাকার অভিনয় করি, কখনও কাউকে ভাল রাখার
জন্য অভিনয় করি এগুলো ছাড়িয়ে কিছু অভিনয়, জীবনের কষ্ট দূর করবার জন্য।
রোহানের
মত বন্ধুর ভালবাসার খানিক খানি ফেরত
দেবার জন্য। রোহান জানে আকাশ অনেক
ভাল বন্ধু। নিরব আর নিরবের মা জানে,
আকাশ অনেক ভাল ছেলে। আর আকাশ
জানে রোহানের মত বন্ধু হয় না। জীবনের
অভিনয়ের ক্ষেত্র পেড়িয়ে,
সম্পর্কগুলো এভাবে ছড়িয়ে যায়।
ভালবাসা এভাবে বিস্তৃত হয়। হয়ত জীবন
গুলো হুট করে, অভিনয়
করতে করতে থেমে যায়। তবুও
ভালবাসা গুলো রয়ে যায় সারাজীবন।
.
আসলে এই পৃথিবীটা ই একটা রঙ্গমঞ্চ,এখানে আমরা
অভিনেতা।প্রতিনিয়ত নানা চরিত্রে অভিনয় করে চলেছি।কখনো হাসি,কখনো কান্না,কখনো পাওয়ার আনন্দে ভাসি,কখনো না পাওয়ার অগ্নিতে দগ্ধ হই।
আমরা সবাই ই লেখকের লেখা গল্পের একটা চরিত্র,,আর আমাদের চারপাশে যা ঘটে
সবই স্ক্রিপ্ট।আমরা শুধু ভাবি যে আমরা দৃশ্যপট বদলে দিচ্ছি,,,,আসলে গল্প বা
কাহিনীটা সেভাবেই লেখা,আমাদের কিছুই করার নেই।
এই যে আমরা তৈরি করা
স্ক্রিপ্টে অভিনয় করছি সেখানে নাটক বা সিনেমায় অভিনয় করা নায়ক- নায়িকাদের
সাথে দারুন একটা অমিল বা পার্থক্য রয়েছে।নাটক বা সিনেমার নায়ক-নায়িকারা
দুঃখ বা কষ্টের অভিনয় করলে যেমন কষ্ট পায় না,,তেমনি করে আনন্দের অভিনয়
করলেও আনন্দ পায় না।কিন্তু আমাদের জীবনের দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা সবই
বাস্তব।কারন আমাদের জীবনটা তো আর নাট্যমঞ্চ নয়,,অনিশ্চয়তা ও অজানা এক
প্রবাহমান নদীর মতই হলো আমাদের জীবন যার আদি অন্ত সবসময় অজানা ই থেকে
যায়.........
ইদানীং টাকা চায় না রোহানের কাছে।