
বধুবেশে বসে রয়েছে আনহা। অন্যান্য বাসর ঘরের চেয়ে এই বাসর ঘরটি ভিন্ন। কারণ এটিকে কোনো ফুল দিয়ে সাজানো হয় নি। বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন থাকে প্রতিটি মেয়ের কিন্তু আনহার আর কোনো স্বপ্ন নেই কারণ এই বিয়েটাই যে স্বাভাবিক বিয়ের মতো না। তাই তার অনুভূতিগুলোও তাকে দেখা দিচ্ছে না। হঠাৎ আনহা লক্ষ্য করলো একটা পিচ্চি মেয়ে ওকে উকি দিয়ে দেখছে। মেয়েটার দিকে আনহা তাকাতেই মেয়েটা দৌড় দিলো। আনহা জানে মেয়েটা কে। এটা আনহার প্রথম বিয়ে হলেও আনহার যার সাথে বিয়ে হয়েছে তার দ্বিতীয় বিয়ে। তার দুটো বাচ্চা আছে। একটার বয়স ৫ বছর আরেকটার ৪ মাস। আনহার বরের নাম আরাভ। আরাভের প্রথম স্ত্রী দ্বিতীয় বাচ্চাটির জন্মের সময়ই মারা যায়। তারপর জোড় করে যে আনহার সাথে তার বিয়ে দেওয়া হয়েছে তাও আনহা জানে। আনহা যে অফিসে কাজ করে তার বস আনহাকে মেয়ের মতো ভাবে। তাই আনহার সমস্যার কথা জেনেও আনহাকে তার ছেলের বউ করেছে। হুম আনহার একটি সমস্যা আছে। সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। বাচ্চা নিয়ে সব মেয়েরই অনেক শখ আনহারও ছিলো। কিন্তু তা এখন সম্ভব না। অনেক ছোট করেই বিয়েটা হয়েছে। কিছু সময় পর আরাভের মা আনহা যেই রুমে বসে ছিলো সেই ঘরে এলো।
=> তোমার সমস্যা হচ্ছে কি মা? (আরাভের মা)
=> না কোনো সমস্যা নেই। আপনি বসুন এখানে। (আমি)
=> তুমি আমার মেয়ের মতোই। জানো কিছু লুকাবো না আমি তোমার কাছে। আরাভ বড্ড ভালো ছিলো। স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু কোন এক মেয়ে ওকে অনেক বড় ধোঁকা দিয়েছে। তারপর থেকে ওর রাগ বেড়েছে। ও কথা কম বলে। ও মিশেও না কারো সাথে। ইরাও (আরাভের প্রথম স্ত্রী) আরাভকে মানাতে পারে নি ভালো করে। তবুও কিছুটা স্বাভাবিক হতে ধরেছিলো। কিন্তু এর মাঝেই ইরা চলে গেলো। (আরাভের মা)
=> উনার বাচ্চাগুলোর নাম কি? আর ছোট বাবুটা কই? (আমি)
=> আয়রা আর আয়াভ। আয়াভ ঘুমিয়েছে। আয়রাও হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। মা বাচ্চাদুটোও কেমন হয়ে গেছে। আয়াভ তো জন্মের সাথে সাথেই মাকে হারালো আর আয়রা ও কেমন যেনো চুপচাপ হয়ে গেছে। (আরাভের মা)
=> তারা মা হারা নয়। আমি তাদের মা-ই হয়ে উঠবো। নিজের বাবু না হলেও এই বিয়ের মাধ্যমে আমি দুটো বাবু পেয়েছি। (আমি)
=> তোর অনেক কষ্ট হবে রে মা। এই পরিবারে তোর বড় দুটো ভাবি আছে। বড় দুজন একসাথে থাকে সবসময়। ইরার দ্বারাও প্রায়ই বেশি কাজ করাতো তারা। কিছু বলতেও পারি না রে মা। বুড়ি হয়েছি। (আরাভের মা)
=> ইনশাল্লাহ আমি সব সমস্যা মোকাবেলা করবো। এটা কি উনার ঘর? (আমি)
=> হ্যা। কিন্তু মনে হয় না ও রাতে ফিরবে। অফিসে বসে কাজ করছে। বাচ্চাগুলোর প্রতিও গুরুত্ব নেই। আগেও ছিলো না। এখন তো আরো নাই। খারাপ কিছু না খেলেও ও সবসময় নিজেকে কোনো না কোনোভাবে ব্যস্ত রাখে। (আরাভের মা)
=> কাল ফিরবেন উনি? (আমি)
=> হয়তো। তোর ভাগ্যও খারাপরে মা। নাহলে বিয়ের প্রথম দিন কে এসব শুনে। কাপড় বদলে শুয়ে পড়। (আরাভের মা)
=> হয়তো ভাগ্যই। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা। হয়তো পরীক্ষা এটা। আচ্ছা আমি নামায পড়ে বাবুগুলোর সাথে দেখা করতে চাই। (আমি)
=> আচ্ছা আমি কিছু সময় পর খাবার নিয়ে আসছি। খেয়ে নিয়ে যাবো ওদের ঘরে তোকে। (আরাভের মা)
=> আচ্ছা। (আমি)
.
শাড়ি পাল্টে আমি নামায পড়ে নিলাম। যদিও বিয়ের রাতে নামায স্বামীর সাথে পড়তে হয়। কিন্তু আমি একাই পড়ে নিলাম। কিছু সময় পর আরাভের মা খাবার নিয়ে এলো। আমি কিছুটা খেয়ে বাচ্চাগুলোর ঘরে গেলাম। বাচ্চাদুটো অনেক মিষ্টি। আমার বাচ্চা অনেক ভালো লাগে। তাই মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। হাত বুলানোর সাথে সাথেই মেয়েটি জেগে গেলো। আমাকে দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে অন্য দিকে এগিয়ে গেলো।
=> এটা তোর নতুন মা ভয় পাচ্ছিস কেনো? (আরাভের মা)
=> দিদু আন্টিটা আমার আম্মু কিভাবে? আমার আম্মু তো এটা। (একটা মেয়ের ছবি দেখিয়ে) আন্টি না। (আয়রা)
=> তোমার আম্মু আমিই গো। জানো আল্লাহ আমার চেহারা বদলে দিছে। আমিই তোমার আম্মু। আসো আমার কাছে। (আমি)
=> তুমি সত্যি বলছো? (আয়রা)
=> হুম সত্যি মামুনি ।(আমি)
=> হুম এটা তোর মা। আনহা মা তুমি কি এখানে থাকবা নাকি ঘরে যাবা? (আরাভের মা)
=> এখানেই থাকবো আমি আমার বাবুগুলোর সাথে। (আমি)
=> আম্মু আমি তোমাকে অনেক মিস করছি। জানো বড় আম্মু আর ছোট আম্মু অনেক পঁচা। আমাকে মেরেছে অনেকবার। (আয়রা আমার কোলে এসে বললো)
=> আমি সবাইকে বকা দিবো মা। ভাই কখন ঘুমিয়েছে? ও খেয়েছে? আর তুমি খেয়েছো?(আমি)
=> হুম দিদু খাইয়ে দিয়েছে। জানো আম্মু দিদু আর দাদু আমাকে আর ভাইকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু বাকীরা আর বাপি আমাদের ভালোবাসে না একদম। (আয়রা)
=> সবাই বাসবে মা। (আমি)
=> আচ্ছা দিদু তোমাকে আনহা কেনো বললো? তোমার নাম তো ইরা। (আয়রা)
=> এট আমার নতুন নাম মা। (আমি)
=> সুন্দর নাম। আম্মু আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেও না গান গেয়ে। (আয়রা)
=> আচ্ছা ঘুমাও। (আয়রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। আর ভাবতে লাগলাম উনি কেমন বাবা যে তার সন্তানদের এমন করে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।)
.
সেদিন রাতটা বাবুগুলোর সাথেই ঘুমালাম। রাতে কয়েকবার আয়াভ উঠেছিলো। ওকে ফিডার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। আমার কোলে অদ্ভুদভাবে শান্ত থাকে। ওকে কোলে নিলে আমারও মনটা আনন্দে ভেসে উঠে যেন এটা আমারই সন্তান। না আমারই সন্তান তো। আমার ছেলে-মেয়ে এরা।
.
সকালে ফজরের নামায পড়ে ঘরের বাইরে গেলাম। দেখলাম মা (আরাভের মা) কুরআন পড়ছে। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। তার কুরআন পড়া শেষে...
=> কিছু বলবি? (আরাভের মা)
=> জ্বী রান্নাঘরটা কই? আর নাস্তায় কি খাবেন? আর উনি কয়টায় আসবেন? (আমি)
=> তোর কিছু করতে হবে না। কাজের জন্য মানুষ আছে। আরাভ আরেকটু পরেই হয়তো আসবে। (আরাভের মা)
=> বাকীরা কি ঘুমাচ্ছে? তাদের সাথে পরিচয় হই নি। বিয়েটা হঠাৎ হলো তাই আরকি। (আমি)
=> বড় বউমা বাপের বাড়িতে আর মেঝো বউমা ঘুমোচ্ছে হয়তো। (আরাভের মা)
=> জ্বী আচ্ছা। আমি তাহলে আপনার, বাবার আর আমার জন্য চা নিয়ে আসি। বাবা কোথায়? (আমি)
=> মসজিদে আর ও এখন আসবে না হাঁটতে গিয়েছে। (আরাভের মা)
=> আচ্ছা আমি বানিয়ে আনছি। কিচেন কই? (আমি)
=> ওদিক। আচ্ছা যা। (আরাভের মা)
=> জ্বী। (আমি)
.
সেদিন চা খেতে খেতে সবার বিষয়ে একটু করে জানলাম। এটাও জানলাম বড় ভাবি চেয়েছিলো যেনো তার বোনের সাথে আরাভের বিয়ে হয় কিন্তু মা হতে দেন নি। এসব শুনলাম। হঠাৎ উনি এলেন। সোজা ঘরে গেলেন। মা আমাকে তার ঘরে পাঠিয়ে দিলেন।আমি ঘরে ঢুকলাম তা আরাভ দেখেছিলো ঠিকই কিন্তু আমাকে দেখেও কথা বললেন না। আমি জানি উনি একটু গম্ভীর কিন্তু এতোটা জানা ছিলো না। আমি কথা বললাম।
আমি- ফ্রেশ হয়ে নিন আমি চা আনছি।
আরাভ- আমি চাই নি সো চুপ থাকুন। আমি এখন ঘুমাবো আর কিছু লাগলে কাউকে বলবো।
আমি- জ্বী আচ্ছা। আয়রা আর আয়াভের কাছে যাবেন না?
আরাভ- ওরা ঠিক আছে। দরকার নাই।
আমি- তাদের পিতা আপনি। আপনার দরকার আছে তাদের।
আরাভ- জ্ঞান চাইনি।
আমি- জ্বী আচ্ছা। আমি চা আনছি।
আরাভ- কিহ আমি তো চাই নি।
আমি- না চান। খেয়ে নিন ফ্রেশ লাগবে।
.
বলেই আরাভের জন্য চা বানিয়ে আনলাম। তা আরাভ খেলেও কোনো কথা বললো না। তার গম্ভীরতা হয়তো তাকে আটকালো। কি জানি? কি হবে? কারণ চাওয়া পাওয়া আর নেই আমার। হঠাৎ মাথায় এলো, "আচ্ছা রাজ কি আমাকে মিস করছে? না করবে কেনো। ও তো আমাকে আর চায় না।" এই ভেবে হাসি পেলো নিজের উপর। রাজ আমার ভালোবাসা। তার সাথে রিলেশন ছিলো ২ বছরের। বিয়েও ঠিক হয়েছিলো আমাদের। কিন্তু যখন সে শুনলো আমি মা হতে পারবো না প্রথম প্রথম সাপোর্ট দিলেও পরে মুখ ফিরে চলে গেলো। আগের দিনের কথা ভাবছিলাম এমন সময় কে জানি আমার ওড়নায় টান দিলো। নিচে তাকিয়ে দেখি আয়রা।
পর্বঃ ১
লেখিকাঃ আনহা






ভালো লাগলো।
ReplyDelete