সকাল বেলায় আম্মীর ডাকে ঘুম ভাঙল। ঘুম থেকে উঠতেই মা আমাকে বললেন, জরুরী একটা কাজে বাইরে যেতে আমিও তখন ঝটপট উঠে গোসল করে খাওয়া দাওয়া সেরে বেড়িয়ে পড়লাম।অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি কোন কিছু পাচ্ছিনা। এমন চাঁদি ফাটা রোদে হেঁটে যাওয়ার প্রশ্নই উঠেনা।
প্রায় আধ ঘন্টা পর একটা কঙ্কালসার রিক্সাওয়ালাকে রিক্সা নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখলাম। রিক্সাওয়ালা লোকটা মাঝ বয়সী। আমাকে নিয়ে দ্রুত গতিতে প্যাডেল ঘুরিয়ে রিক্সা চালাচ্ছেন। প্যাডেল মারতে মারতে একসময় কাশি ওঠে তার। খুক খুক করে কাশতে লাগলেন তিনি।
আমি বললাম, "রিক্সাটা সাইট করে থামান।"
তিনি রিক্সাটা থামালেন। তারপর খুক খুক করে কাশতে কাশতে অনেকটা কুজো হয়ে গেলেন। দুই হাঁটুতে হাত রেখে তার উপর ভর করে কুজো হয়ে থাকলেন কিছু সময়। সোজা হয়ে ডান হাত দিয়ে বুকের বাঁ পাশটায় চেপে ধরলেন খানিক।
হয়তো ব্যথা করছে সেখানটায়।
"পারবেন তো? এখনও অনেক পথ বাকি।" "পারমু বাবা পারমু।
মাঝে মইধ্যে কাশিডা একটু ওডে এই যা।"
চালকের আসনে বসে স্বাভাবিক ভাবেই প্যাডেল মারতে লাগলেন পুনরায়। প্যাডেল মারতে মারতে বলে ফেললেন জীবনের অনেক কথা।
একটা ছেলে আছে তার ঢাকা শহরে থাকে। শক্ত- পোক্ত কর্মঠ ছেলে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বিয়ে করে আলাদা সংসার নিয়ে থাকে এখন। বাবা-মা'র খবর নেবার ফুরসত মেলে না সেই ছেলের। কোনদিন ভুল করেও খোঁজ নিয়ে দেখে না, কেমন আছেন তার। এ বয়সে কিভাবে কাটছে তাদের দিনগুলো।
দুইটা মেয়ে ছিল, বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। স্বামী-সংসার নিয়ে মোটমুটি ভালোই আছে তারা।
জিজ্ঞেস করলাম, "বাড়িতে জমি- জিরাত আছে কিছু?"
দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললেন,
"আছে বাজান আছে। ভিটা-বাড়ি ম্যালা কিছু আছে।"
"বেচে দেন না কেন? বেচে নিজে চিকিৎসা করান। একসময় তো বদমাইশ ছেলে এসে ভাগ বসাবে। মরলে দেখবেন পরের দিনই এসে উঠবে।"
"বাজান, ঐ জমির হকদার আমার পোলা। যদি বেইচা দেই পোলাডা শেষ বয়সে কই যাইয়া মাথা গুজবো কন?"
যে সন্তান অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মার খোঁজ-খবর নেয় না। কোনও দিন ভুল করেও জানতে চায় না, তারা কেমন আছে। সেই অভিশপ্ত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে পিতার এই দুশ্চিন্তা দেখে নিজের অজান্তেই চোখ দুটো ভিজে ওঠলো আমার।
আমি চুপ করে রইলাম।
আসলে পৃথিবীতে আপাত দৃষ্টিতে যা সত্যি মনে হয়,বেশিরভাগ সময়ই সেগুলো মিথ্যে,আর যেগুলো মিথ্যা মনে হয়,সেগুলোই আসলে সত্যি।কিন্তু আমরা বোকার মত মিথ্যেটাকেই সত্যি মনে করে বারবার ভুল করি। যদি আমরা এমনটা না করতাম,তাহলে মনে হয় দুঃখের পরিমান পৃথিবীটাতে অনেকটাই কমে যেত।
আকাশের দিকে মুখ তুলে একবার তাকালাম। ফাগুনের বিশাল ঝকঝকে আকাশ টুকরো টুকরো আগুনের মত গোলা রৌদ এসে মাথায় পড়ছে। পথ ঘাট উত্তপ্ত রৌদের অগ্নিরুপ ঝড়ে পড়ার মত অবস্হা তাই আবার উঠে বসলাম রিক্সাটায়, ততক্ষণে লোকটা একটু স্বাভাবিক হয়ে এসেছে......
আমরা আসলে ভাবি কাছের মানুষগুলো আমাদের অবহেলা করে। আমরা ভাবি আমাদের এরা পছন্দ করে না।কিন্তু একবারও বুঝি না,অবহেলার সেই স্বরেই মিশে থাকে ভালোবাসা নামক স্বর্গ।
মানুষ মুখোশ পরে থাকতে ভালোবাসে। আমরা মুখোশের আড়ালের মুখটা দেখতে পাই না সহজে। যদি দেখতে পারতাম,তাহলে হয়তো দুঃখ শব্দটা পৃথিবীতে থাকতো না।
জীবনের সকল বাবা-মায়ের আশা- আকাঙ্খা সবকিছুই যে পূর্ণতা পাবে, এমন তো কোন কথা নেই...কিন্তু তাদের ততো আর আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলা যায়না তাদের আত্না হাজার মাইল দূরে থেকেও যে কথা বলে শব্দহীনভাবে... যেটা অনুদিত হয় দু'ফোটা ঘন-কালো, বয়সের ভারে কুচঁকে যাওয়া চোখের নোনতা জলে.........






0 মন্তব্য:
Post a Comment