কলেজের প্রথম দিন ওদের সাথে বসেছিলাম।সেই থেকে শুরু,এখনো চলছে।প্রতিদিন একসাথে বসা,একসাথে চলাফেরা করা ও খেলা করা সব করি একসাথে। আমি,ইভান ও ইরফান তিনজনের একটি নাম পড়ে গেছে কলেজে।"ত্রিরত্ন"।
এখন ডিসেম্বর মাস।শীত এবার বেশ জেঁকে বসেছে। শীতকালে সকালবেলা কাঁথা ছেড়ে বেরুতে মন চায় না।কিন্তু
ক্লাসের জন্য আসতেই হয়।আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায় তাই কিছু না খেয়েই চলে আসি।এখন খিদে ঢের পাচ্ছি।
আজকে প্রথম ক্লাস বাংলা।ক্লাস শেষ হলে স্যার চলে যান।আমি তখন বলি,"ইভান চল ক্যান্টিন থেকে ঘুরে আসি।" আমার কথা শুনে ইভান আর ইরফান এমনভাবে তাকালো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকরতম কথা বলে ফেলেছি।
"মাথা খারাপ হয়েছে?!এখন ড্রাগন স্যারের ক্লাস।কাল যে পড়া দিয়েছেন না পারলে খবর আছে।তাকিয়ে দেখ,সবাই এখন পড়ছে।আর তুই বলছিস ক্যান্টিনে যাবি!" আমি জানি এখন সবাই ইংলিশ বই পড়ছে।না তাকিয়ে বলা যায়।তারপরও আমি সারা ক্লাসে চোখ বুলালাম।
এখন আমাদের ইংলিশ টিচার নাজমুল স্যারের (সবাই ড্রাগন স্যার বলে
ডাকে) ক্লাস।তার ক্লাসে যে পড়া পারবে না তাকে শাস্তি পেতেই হবে।ড্রাগন স্যারকে দেখলে ভুলাবালা মানুষ মনে হয়। ভাবাই যায় না এমন একজন মানুষের মাথা থেকে এত সব অদ্ভুত শাস্তির চিন্তা আসে কি করে!এখন শীতকাল,এখন স্যারের প্রিয় একটি শাস্তি হল বরফের টুকরা দিয়ে শাস্তি দেয়া।যে ছেলেরা পড়া পারবে না তাদের জামার ভিতরে পিঠের কাছে বরফের টুকরা দিয়ে রাখা হয়।এই শীতে বরফের টুকরা!ভাবা যায়!তবে স্যার মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছুটা উদার,তাই তাদের শাস্তি হল দুহাতে বরফের টুকরা ধরে রাখা।
আমি স্যারের এই অদ্ভুত শাস্তির একটি নাম দিয়েছি। "আইস পানিশমেন্ট"।এখন সবাই স্যারের আইস পানিশমেন্ট থেকে বাঁচতে পড়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আমার এখন ক্যান্টিনে যেতে হবে,খুব খিদে পেয়েছে। তাই সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললাম, "বন্ধুরা তোমাদের এত
কষ্ট করে পড়তে হবে না।আজ ড্রাগন স্যারের ক্লাস হবে না।" একজন প্রশ্ন করল,"তকে কে বলেছে?"
"কেউ না, আমার মন বলছে।"
আমার চেষ্টা কাজে লেগেছে। ইভান আর ইরফান বই বন্ধ করে ওঠে দাঁড়িয়েছে। আসলে ওদের ধারনা আমি যা বলি তাই হয়।কিন্তু ওদের ধারনা যে ভুল আমি তাদের বুঝাতেই পারি না।আমরা ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে রুম থেকে বের হতে যাব তখনি ড্রাগন স্যার চলে আসেন।বাদ্ধ হয়ে জায়গায় এসে বসে পড়ি।ইভান ফিসফিস করে বলে,"তুই তাহলে শুধু ক্যান্টিনে যাওয়ার জন্য কথাটি বলেছিস,মন থেকে বললে সত্যিই ক্লাস হত না।"
আমি কিছু বলব তার আগেই ড্রাগন স্যার ড্রাগনের মতো গর্জন করে বললেন, "আজ আর আমি ক্লাস নিচ্ছি না,একটা কাজ আছে।
তোমরা চুপচাপ বসে পড়তে থাকো। যদি কোনো দুষ্টমি করেছ তো এসে দেখে নেব।"
কথাটি বলে তিনি চলে যান।ইরফান বলে,"জানতাম ক্লাস হবে না। ইশানের কথা ভুল হতেই পারে না। আমরা ক্যান্টিনে চলে যাই।আমাদের মতো অনেকেই যায়। সিংগারা খেতে খেতে আমরা কথা বলছি।আমি বললাম, "কয়েকদিন ধরে আমি একটি বিষয় নিয়ে ভাবছি।" ইভান বলে,"কি বিষয়ে?
-এবার অনেক বেশি শীত পড়েছে। অনেক পথ-শিশু আছে যাদের কোনো শীত বস্ত নেই।তারা অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমি ভাবছি আমরা তাদের সাহায্য করব।
এবার ইরফান বলে,
-এটা খুব ভালো একটি কাজ, কিন্তু আমরা তিনজন কি করতে পারি? আমাদের হাতে তেমন টাকাও নেই যে ওদের শীত বস্ত কিনে দেব।
-কিনে দিতে না পারি তবে আমাদের পুরাতন গুলো তো দানকরতে পারি?
-কিন্তু এতে আর কয়জনের উপকার হবে?
-যদি একটি মানুষের কষ্ট কমাতে পারি সেটাই বা কম কিসের।
-রাইট
একমত হয় ওরা দুজনে। আমি সিংগারা খেয়ে শেষ করে উঠে দাঁড়াই।পাশের টেবিলে তূর্য একা বসে আছে।দেখেই বুঝতে পারছি তার মন খারাপ। আমি গিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসলাম।
"কি রে তূর্য, একদিন আসেনি তাতেই এই অবস্থা! চিন্তা করিস না কাল ঠিকই আসবে।"
তূর্য বিষণ ভাবে চমকে যায়।ভিতরে বিস্ময় লুকিয়ে রেখে স্বাভাবিকভাবে বলার চেষ্টা করে,"কে আসেনি? কি বলেছিস?"
আমি উপদেশ দিয়ে বললাম,"আর কত একা একা ভালবেসে যাবি?
এবার তো মিতুকে গিয়ে তোর ভালবাসার কথাটি বল।"
তূর্য যেন এমন কথা তার জীবনে শুনেনি।আর এত অবাক ও আর কখনো হয়নি।
"কিন্তু..... কিন্তু তুই... "
সে ঠিক মতো কথা বলতে পারছে না।আমি তার দিকে পানি বাড়িয়ে দিলাম।সে এক নিশ্বাসে সবটুকু পানি পান করে আবার বলে,
-তুই জানলি কি করে, যে আমি মিতুকে ভালবাসি? আমি এখনো কাউকেএকথা বলিনি।
আমি কিছু না বলে শুধু হাসলাম।অনেকে বলে আমার হাসি না-কি রহস্যময়। আমি রহস্যময় হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে আসলাম।
পিছনে না তাকিয়েই বুঝতে পারছি তূর্য এখনো অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাতে আমরা তিন বন্ধু মিলে আমাদের সব পুরাতন কাপড় পথ- শিশুদের মাঝে বিলিয়ে দেই।আমাদের কাজ শেষ করে এখন তিনজনে মিলে চটপটি খাচ্ছি আর গল্প করছি।তখন দুটি মেয়ে এসে আমাদের পাশের চেয়ারে বসে ফুচকার অর্ডার দেয়। আমি তাদের একজনের দিকে তাকালাম। মেয়েটিও আমার দিকে তাকালো।সাথে সাথে প্রায় চিতকার দিয়ে ওঠে,"ইশান তুই?"
-হুম,কেমন আছিস মারিয়া?"
-আমি ভালো তোর খবর কি?"
তারপর সে আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে তার সাথের মেয়েটিকে বলে,"সুলতানা এই হল আমাদের আধুনিক হিমু সাহেব। যার কথা তকে বলেছিলাম।"
-তাহলে আপনি সেই মানুষ যিনি এই যুগে এসেও মোবাইল ব্যবহার করেন না।"
আমি হাসলাম।তারপর বললাম,"পরিচয় করিয়ে দেই,ওরা আমার বন্ধু ইভান আর ইরফান।"তারপর মারিয়াকে দেখিয়ে বলি,"ও হল মারিয়া,আমার স্কুল লাইফের বন্ধু।"
এবার মারিয়া বলল,"ও সুলতানা,আমার বান্ধবী।"
সুলতানা বলল,"আচ্ছা আপনি কি নিজেকে হিমু মনে করেন?"
-নাহ,আমি নিজেকে মানুষ মনে করি।
-কেন হিমু কি মানুষ না?"
আমি হাসলাম।
"আমি এবং আমরা, সবাই জানি যে হিমু হুমায়ূন স্যারের সৃষ্টি একটি কাল্পনিক চরিত্র মাত্র।কিন্তু তিনি হিমুকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে আমাদের সবার মনে হয় হিমু কোনো জীবন্ত মানুষ। হিমুকে তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী পরিচালনা করেছেন।
কিন্তু আমায় পরিচালনা করছেন উপর থেকে একজন। শুধু আমায় নয় সকল মানুষকেই।তাই বলেছি আমিও অনান্য মানুষদের মতোই সাধারণ একজন।"
সুলতানা আবার বলল,
-তাহলে বলেন আপনার মোবাইল ব্যবহার না করার পিছনে যুক্তি কি?
-যুক্তি কিছুনা,আমার মনে হয় এটা অপ্রয়োজনীয় বস্তু।খুব মারাত্মক ডিস্টার্ব করে এই বস্তুটি।
-ঠিক বুঝলাম না!
-এই ধরেন এখন আমি এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছি।যদি মোবাইল সাথে থাকত হয়তো মা ফোন করে বাসায় যেতে বলত,আড্ডায় ডিস্টার্ব হল না?মোবাইল সাথে নেই কোনো ডিস্টার্ব ও নেই।
-এটাতো হিমু টাইপের কথাই বললেন।
-মোটেও না,হিমু হলে বলত তার হলুদ পাঞ্জাবীতে কোনো পকেট নেই তাই মোবাইল রাখে না।কিন্তু আমার প্যান্টে পকেট আছে আর তাতে টাকাও আছে।হিমু কিন্তু টাকা সাথে নিয়ে ঘুরে না।
এবার হাল ছেড়ে দেয় সুলতানা,"উফ,আপনার সাথে কথায় পারব না।
এবার মারিয়া বলে,"তোর একটি কথা কিন্তু ঠিক হল না?
-কোন কথা?
-তুই বলেছিলি আমি কলেজে আসার ১ মাসের মধ্যে আমার প্রেম হয়ে যাবে।কিন্তু ছয় মাস হয়ে গেল প্রেম মশাই আমার
কাছেই ঘেঁষল না।এই প্রথম তোর কথা ভুল হল।
-মানুষ অধিকাংশ কথাই ভুল বলে।আর আমি সবচেয়ে বেশি ভুল কথা বলি।যার দুই একটি মিলে যায়।আর এতেই তুরা ভাবিস আমি আগে থেকে সবকিছু জানতে পেরে যাই।শুধু মাত্র একজন আছেন সবজান্তা,তিনি ছাড়া অন্যকেউ কিছুই জানে না।আর যারা বিশ্বাস করে মানুষ ভবিষ্যৎ বলতে পারে তারা চরম পর্যায়ের বোকা।
তারপর আমরা বেশ কিছুক্ষণ গল্প করি।বিদায় নেয়ার সময় মারিয়া বলে,"আন্টির মোবাইল নাম্বারটা দে।তোর সাথে এছাড়া যোগাযোগ রাখা সম্ভব নয়।"
আমি নাম্বার দিলাম।যাবার সময় সুলতানা বলল,"মারিয়া আপনাকে মিথ্যে বলেছে।মারিয়ার ক্ষেত্রেও আপনি ঠিক ছিলেন।মারিয়া প্রেম করছে।তাও কলেজে আসার এক মাসের মধ্যেই হয়েছে।
-আমি জানি,তার মিথ্যে প্রথমেই আমার চোখে ধরা পড়েছে।
-কিন্তু আপনি কিভাবে বুঝতে পারেন?
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।সাধারণত এমন প্রশ্নে আমি হাসিউপহার দেই।এবারো তাই করলাম।আমার এই হাসির অর্থ,কিছু বলতেচাচ্ছি না তোমার যা ইচ্ছা বুঝে নাও।কিন্তু অধিকাংশ লোকই কিছু না বুঝে আমার এই হাসিকে হিমুর হাসির সাথে মিলিয়ে দেয়। কেউ,কোনো দিন হিমুর হাসি দেখেনি, কিন্তু সবাই কল্পনা করে নিয়েছে হিমুর হাসি কেমন। এটাই একজন লেখকের গুন।তার চরিত্রকে দিয়ে পাঠক মনে প্রভাব খাটানো। কিন্তু আমি কোনো লেখকের সৃষ্টি চরিত্র নয়,সৃষ্টিকর্তার তৈরিকৃত এক
জীব মাত্র।






0 মন্তব্য:
Post a Comment